গতি’র শিল্পী জয়নুল

Joynul1451377530

এ দেশের শিল্প ভুবনের পথিকৃৎ, প্রকৃতি ও গণমানুষের চিত্রকর, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংশপ্তক শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অবদান অসামান্য। তাঁর সহজিয়া রীতিতে আঁকা চিত্রকর্মগুলো অক্ষয় কীর্তি হয়ে আছে- থাকবে। শিল্পীর আঁকা দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা ছাড়াও বিদ্রোহী, গুনটানা, সাঁওতাল রমণী, সংগ্রাম, গ্রামীণ নারীর চিত্রমালা শীর্ষক ভাস্কর্য শিল্পকলায় আমাদের জাতীয় সম্পদ হিসেবে রয়েছে। তিনি বাংলার প্রকৃতি, জীবনাচার, প্রাচুর্য, দারিদ্র্য এবং বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহা ইত্যাদি তুলি আর ক্যানভাসে মূর্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই বিকশিত হয় এ দেশের চারুশিল্প মাধ্যম। বিশেষত তাঁর ছবিতে যে গতির ব্যবহার এটা আগে কোনো বাঙালি শিল্পী করেছে বলে আমাদের জানা নেই।

চিত্রকলায় গতির ব্যবহার জয়নুল শুরু করেন বিদ্রোহী, মুক্তিযোদ্ধা, গুনটানা কাজগুলোর মধ্য দিয়ে। সভ্যতার শুরুতে চাকা আবিষ্কার এবং এর মাধ্যমে সভ্যতা যে গতি পেয়েছিলো, জয়নুল সে গতি দিয়েছিলেন চিত্রকলায়। চিত্রকলায় তাঁর গতি প্রদানের পর আমরা একজন শাহাবুদ্দিনকে পেয়েছি। যিনি গতি নিয়েই কাজ করেন। সাক্ষাৎকারে শাহাবুদ্দিন অকপটে স্বীকার করেছিলেন এই বলে যে, ‘আমার গুরু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। যার কাছ থেকে আমি বস্তুর গতি নিয়ে কাজ করতে শিখেছি।’

দেশের চিত্র তথা শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ায় জয়নুল অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। আর এর পেছনে কাজ করেছে তার দূরদর্শী চিন্তা-চেতনাসহ কঠোর ত্যাগ ও পরিশ্রম। তাঁর শিল্পের মানুষেরা খুবই সাধারণ। সমাজের অবহেলিত চাষি, মজুর, জেলে, মাঝি, গাড়োয়ান, সাঁওতাল কন্যা, বেদেনী, মা- এরাই বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে তাঁর ক্যানভাসে। তাঁর সময়কালও ছিল এমনই, যখন মড়ক-দুর্বিপাক হানা দিচ্ছে বাংলার ঘরে ঘরে। কাক ও কুকুরের সঙ্গে বুভুক্ষু মানুষের ডাস্টবিন থেকে খাবার খাওয়ার দৃশ্য, মানুষের লাশ ঠোকরাচ্ছে কাক ও শকুন; ফুটপাতে, রাস্তায় পড়ে থাকা নিরন্ন ক্ষুধার্ত মানুষের ছবি তাঁর মননশীলতার অনন্য প্রকাশ।

একজন শিল্পী সমকালীন ভাবনা বা শিল্পের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ হলে এই বিষয়গুলো উপজীব্য করে হাতে তুলি তুলে নেন তা আজকের দিনে নতুন করে আমাদের ভাবিত করে। আসলে জয়নুল আবেদিনের ছবি না দেখলে এটা বোঝা যায় না। তাঁর মূল ভাবনা ছিল, এ দেশের তরুণদের শিল্পমনস্ক করা। রাজধানী শহর ঘুরে ঘুরে তিনি আর্ট স্কুলের শিক্ষার্থী, মডেল খুঁজে বেড়াতেন এবং এসব নিয়েই কেটে যেত সময়। পথ চলতে চলতে তিনি একদিন আবিষ্কার করলেন মমিন মৃধাকে(প্রয়াত চারু দাদু)। মমিন মৃধা তখন এক ম্যাজিস্ট্রেটের বাসায় মালির কাজ করতেন। শিল্পাচার্য তাঁর দেহের গঠন দেখে বুঝে ফেলেন যে, তাঁকে দিয়ে আর্ট স্কুলের মডেলের কাজ করানো যাবে। এভাবে মমিন মৃধা থেকে শুরু করে অনেককেই তিনি বাবা-মার কাছে বলে নিয়ে আসতেন। তাঁর স্বপ্নের চারুকলার আন্দোলন তিনি এভাবে করেছেন। মাত্র দু’কামরার সেই ইনস্টিটিউট ১৯৫৬ সালের মধ্যেই তিনি আধুনিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করেন। তাঁর স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠান পরবর্তীকালে ‘পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়’ এবং স্বাধীনতার পরে ‘বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়’-এ রূপান্তরিত হয়। (আরো পরে মহাবিদ্যালয়টি সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তান্তরিত হয় এবং এর বর্তমান পরিচয় ‘চারুকলা ইনস্টিটিউট’ নামে)।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে যারা পড়তে এসেছেন, তারা পরে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। কথাটি এ জন্যই বলা যে, দেশের ছেলেরাও এর বাইরে কখনও ছিল না। তারা বরং চারুকলা আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশজুড়ে। এই শিল্প আন্দোলন শিল্পাচার্যের স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন। ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর জয়নুল কিশোরগঞ্জ জেলার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। স্বদেশে নিজস্ব শিল্পাঙ্গন বা শিল্প পরিবেশ আর শিল্পী সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্নের জাল বুনেছেন আজীবন। তিনি এ দেশের শিল্পকলার পথিকৃৎ।

শিল্পাচার্য তার কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছেন জন্মভূমির শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের ঐতিহ্য সংরক্ষণে। তাঁর জীবনী পাঠ্যপুস্তকে সন্নিবেশিত করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই মহৎ শিল্পীর সম্পর্কে তো বটেই তাঁর চিত্রশিল্প সম্পর্কে অজ্ঞ রয়ে যাবে। তাই তাঁর জীবন ও কর্মপ্রকাশ জরুরি। তাঁর জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এ সম্পর্কিত আরো লেখা