মাজহার সরকার- এর কবিতা

kaEC7EoS6h5l1v80u0

শহরে একটা তালিকা হয়েছে

শহরের দেয়ালে একটা তালিকা টানানো হয়েছে। মানুষেরা জড়ো হয়েছে সেখানে। পরস্পরের কাঁধের ওপর দিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতায় প্রত্যেকে নিজের নাম খুঁজতে ভিড় করে সেখানে। ছাপা কাগজে আঙুল চেপে ওপর থেকে নিচে খুঁজে যাচ্ছে যার যা আকাঙ্খিত নাম। কেউ নাম খুঁজে পেয়ে হাস্যধ্বনি আর শিস বাজাতে বাজাতে বাড়ি গেছে। কারও কান্না। কেউ প্রথম পাতায় না পেয়ে গেছে পরের পাতায়, আবার নিচ থেকে ওপরে- তারপর অন্য পাতায়। তালিকা- তালিকা- শহরে একটা তালিকা হয়েছে। সৌভাগ্য, স্বাস্থ্য আর সম্পদ প্রত্যাশি তালিকা। আমরা কী এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে পেরেছি? পৃথিবীর পিঠের ওপর আমাদের আঙুলের কষ্টে- এইসব সংখ্যা ও ক্রমের সাথে আমরা আমাদের ভাবিতব্য অনাগত শীতে লুকিয়ে রাখি।

এক নবজাতকের ছবি দেখে

হাসপাতালের পাশে স্তুপের ভেতর পলিথিনে পাওয়া গিয়েছিলো শিশুটি। হয়তো কোন অসফল অপরারেশনের কারণে, মিউকাস আর প্লাসেন্টার সাথে জঞ্জালে চলে এসেছে। নাভির কাছে এম্বিলিকল কর্ড ঝুলছিলো তখনো। মানুষের রক্তহীন মাংসের টুকরা, ছুরির দাগ তখনো দগদগ করছে হাতের কাছে। মায়ের নিরানন্দ প্রসবের কালে ফ্লুইড আর অমরার শাঁসে ঘেরা সৌন্দর্যের গানে। মায়ের গলায় প্রসবের কোঁত- পা দুটো আরো ছড়িয়ে দুটো পাহাড়ের মতো হয়েছিলো- আর তার মাঝখান দিয়ে সাদা ঘোড়া ছুটিয়ে আসছিলো দেবদূত। মায়ের অধরে জমা হয়েছে বিন্দু বিন্দু ঘাম- পাশে রাখা হয়েছিলো রক্তাক্ত এক আকারহীন পিন্ডের অবশেষ। অথচ জন্মানোর পর তাকে জড়ানোর কথা ছিলো নীল চাঁদের চাদরে- অবশেষে পড়ে আছে নির্ভাজ চাদরে। আমি শুচিতে মুখ সরিয়ে নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু প্রবল ঘৃণায় আরো ভালোভাবে দেখলাম, ডাক্তার বা গাইনী যা করছিলো। আরও বিস্ময়- মানুষ সত্যি প্রশংসনীয়। আমি আর চেষ্টা করবো না, আমি পারবো না, আমি যাবো না। পরিণামে- ভোগে যে পক্ষেরই জয় হোক- আমি খালি দেখে যাবো। জীবনের বিসর্জনে মানুষের চেহারা তাহলে মৃতের মতো! সমগ্র জীবনকে সৌন্দর্যের অধীনে দিয়ে আমি একা হেঁটে যাবো অবশিষ্ট আঘাতে- যেভাবে মানুষ একে অপরকে খুশি করে, বেঁচে থাকার আনন্দে যারা আরেকটু বেশি ঘেষে পরিতৃপ্ত বালিশে। আমি মরে যাবো- একশো দশবার হেরে যাবো- চলে যাবো- মাথা নিঁচু করে, নিচে মানুষ দেখতে দেখতে শহরের ওপর দিয়ে উড়ে যাবো।

প্রতিদ্বন্দ্বি

মানুষ একদিন তার নিজ বিজ্ঞানের দিকে ফিরে যাবে- ডানাবাহিত রোদে শালিকের সতীর্থরা- একটা ত্রিভূজ বানিয়ে ঝাঁকের পূর্ণতায় জমাট বেঁধে- গলায় ঢেউ নিয়ে খেলে ওড়ে যায়- অন্য পাখিদের থেকে ওরা বেশি সূর্যের দাঁড়িয়েছে কাছে। তাকে ঘেঁষে- আবার গোত্তা মেরে নিচে নেমে- ছুঁয়ে- সবুজের বুকে ধরা শস্যের দিকে সরে হিমের ঋতু আর রাগে। আমার চিবুক অবধি একটি ছায়া নিয়ে আসে সেখানে অভ্যূদয় আছে। আমি জানুভরে নিজেকে তুলে নিলাম মুগ্ধ জীবেদের সাথে- প্রতি অংশতে প্রতি অংশের বেদনা ভাগ করে। তবু মানুষ, অনেকটাই শৌখিন- কিছুটা মূর্খ, যে যার মনোযোগে বা যুতে নিজের নিষ্ঠা নিয়ে দাঁড়ায়। মানুষের প্রণয়ের থেকে অধিক কোন আশ্বাস নেই- সেই প্রথম মূল কিংবা জ্ঞানে- তারা ওঠে আসে দুই হাজার সৌরবর্ষ থেকে। মানুষের রক্ত থেকে প্রাচীন কিংবা অগ্রসর কোন স্রোত নেই। মানুষ একদিন পৃথিবীর ত্রুটির ভেতর নিজের স্বরের চেয়ে অধিক শান্ত হয়ে যাবে- আর কোন জিজ্ঞাসা নেই- প্রত্যেকে তার আয়ু থেকে এসে প্রতি অঙ্গের সায় নেবে।

কুকুর ভালো কুকুর খারাপ

আমি কুকুর ভয় পাই
এ কথা তারা জেনে গিয়েছিলো
অন্য লোকজন মিলে একদিন আমাকে সেই রাস্তা দিয়ে
কথা বলতে বলতে নিয়ে গিয়েছিলো
যে বাসায় খোলা কুকুর ছিলো আর ভয়ানক ডাকতো।
প্রথম বুলেটের শব্দে বিচলিত পাখির মতো
পিঁপড়ার চিৎকারে বিব্রত কবরমৃতের মতো
বুকের মাটিতে কোদালের উপুর্যপরি কোপে
নিজের হৃৎপিন্ড আকঁড়ে ধরে দাঁড়িয়ে
দেয়াল ঘেঁষে গেছিলাম
মনের রাজহাসঁগুলো স্তম্ভিত ডেকে ওঠেছে।
কৌতূক করে হাসতে হাসতে লোকগুলো রিক্সায়
ওঠে গেছিলো, ঘাসের কাছ থেকে
তরুণ গাভীটিকে ডেকে এনে বলেছিলো
এমন কথা- হাঃ হাঃ কি হাস্যকর!
অথচ আমার বুকের কাছে নতজানু রাইফেল
আমার মুঠোর তলে লজ্জিত যে কোন ঐশ্বর্য
কুকুর ভালো, কিন্তু তার ভক্তি-ই সন্ত্রাসের ছদ্মবেশে থাকতে পারে।

মৃত্যুচোয়াল

সেদিন প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিলো। রাস্তায় পানি জমে গিয়েছে। দ্রুত পানি সরার জন্য ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে একটা লাল পতাকা ঝুলানো হয়েছে। হাঁটুতে প্যান্ট ভাঁজ করে জুতো জোড়া হাতে আমি দাঁড়িয়ে আছি একটা খালি রিক্সার জন্য। ঘূর্ণি খেয়ে পানিগুলো গাড়ির চাকার তোড়ে ম্যানহোলের ভেতর ঢুকছে। তখন দেখতে পেলাম আমাদের শহর পুরাতন। মুরগীর ডানা, লাউয়ের ছিলা, ঋতুস্রাব লাগানো প্যাড, প্লাস্টিকের খেলনা, চেয়ারের ভাঙা টুকরা- যা কিছুর প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে শহরের কাছে- যা কিছু বহু জীবন স্পর্শ করে এসেছে- আমার দিকে অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিয়ে সে নোংরা জল এখন বুড়িগঙ্গা হয়ে সমুদ্রকে অনুসরণ করবে।

সেখানে আরও ছিলো- সঙ্গীহীন একটা ছেঁড়া স্যান্ডেল, পেঁয়াজ চোকলা, থই পেতে গিয়ে তলিয়ে আমাদের চারপাশ থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে। একাকি ঘোড়ার মতো তৃণ ভেসে চলে- মৃত্যুচোয়ালের মতো ম্যানহোল যেন পৃথিবীর গহ্বর, একটি প্যাড তার কুমারীর কাছে অপরিচিত হয়ে গেছে, একটি চেয়ার তার আসনগ্রহীতার কাছে। ইতিহাস তার সকল বেদনা নিয়ে আজকের এই ক্ষতের মতো গভির- বিস্তৃতির কাছ থেকে কে বাঁচে! মানুষের ঊরু, চুল থেকে গোড়ালির মৃত চামড়া- শহর যা কিছু ফেলে দেয়, শহর যা কিছু হারিয়ে ফেলার অভ্যাসে আছে- সেগুলো আর কে রাখে! চোখের ভ্রুর নিচে একাকি ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমি একটা খালি রিক্সার জন্য অপেক্ষায় থাকলাম।

মাজহার সরকার:
জন্ম ২৪ অগ্রহায়ণ ১৩৯৩ (৮ ডিসেম্বর ১৯৮৬)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পড়াশুনা করেছেন। প্রথম কবিতার বই ‘সোনেলা রোদের সাঁকো’ এর জন্য পেয়েছেন ‘সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরষ্কার। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ ‘শরতের বাস টার্মিনাল’, ‘শূন্য সত্য একমাত্র’ ও ‘গণপ্রজাতন্ত্রী নিঃসঙ্গতা’, গল্পের বই ‘ আগ্নেয় আশ্বিনের তামুক’। বর্তমান পেশা সংবাদপত্রকর্মী।

এ সম্পর্কিত আরো লেখা