সারাক্ষণ শুধু হাওয়া-বাতাসের শব্দ : তুহিন দাস

cJjnAzCKo2dn

সারাক্ষণ শুধু হাওয়া-বাতাসের শব্দ, কবিতার শব্দ। সবকিছুর মধ্যেই কবিতা আছে, সব আলোর মধ্যে, সব অন্ধকারের মধ্যে, সব জিজ্ঞাসার মধ্যে, সব জ্ঞানের মধ্যে, সব অজ্ঞানের মধ্যে। সে আছে আলোকসম্ভবে, স্বপ্নসম্ভবে। ওই যে মনে করেন বিপ্লবী ছেলেটি, কবিতা লেখে, যার সঙ্গে আমার দেখা হয় মাঝেমাঝে রাস্তায়- চায়ের আড্ডায় সে কবিতা লিখে যাচ্ছে, তার প্রেমিকা বিয়ের অপেক্ষায়, ঘরে আরেকটা বোন সোমত্ত হয়ে উঠছে, কিন্তু বিপ্লবী ছেলেটি কবিতা লিখে যাচ্ছে দ্রোহের-প্রেমের। লিখে রাখছে ভাত রান্নার গল্প, লিখছে সেলফি-ইজম, লিখছে বিকল্পপ্রস্থান। তাকে তাড়া দিয়ে যাচ্ছে প্রেমিকা, আর সে লিখে যাচ্ছে, মনে করুন-

সারাটা জীবন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো
লোকের কাছে চিঠি লিখেছো তুমি; বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে
মা’র ক্যান্সার আর ছেলেটির বাবা রাস্তায় পড়ে ছিলো মৃত,
তার পকেটে পাওয়া গিয়েছিলো লটারির টিকিট
এই সমস্ত সংবাদ তুমি পাঠিয়ো বিকেলবেলার ব্রিজের ওপাশে
যখন একটি ছেলে ও একটি মেয়ে হেসে হেসে কথা বলে
আর আমাদের বস্তাবন্দী স্বপ্ন ও রাত্রিবেলার ঘুম
টেনে নিয়ে যাচ্ছে দূরের কোনো রেলগাড়ি

এই তো জীবন! জীবনের স্রোত! যেখানে কবিতা লেখার কথা ছিলো বিপ্লবের সেখানে ছেলেটি মহৎ পরিচিকীর্ষার মতো কবিতা লিখছে তার বাস্তব জীবনের; বিপ্লব ও বাস্তবতার ফারাক থেকে-আর্থরাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে কবিতা উঠে আসছে, সে লিখছে নিরুদ্যম ধৃতি নিয়ে, আমরা এমনটি দেখছি।

না। কবিতার সন্তোষদিন শেষ হয়নি। কবিতার প্রয়োজন ফুরায়নি। জীবনেও ফুরায়নি। রাস্তায়ও না। আকাশে শতমেঘ; তবু কবিতার ঋতু খুললে দেখা যায় তার ভেতরে সাতটি রঙের গোলাপ ফুটে আছে। আমাদের সকল জ্ঞান-মহাজ্ঞান-অভিজ্ঞতা-মহাঅভিজ্ঞতার ওজন কাঁধে নিতে পারার মতো প্রজ্ঞার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নির্ভার হওয়ার জন্য নিজেকে যে কিছু মুহূর্ত কবিতায় সমর্পণ করি তার ক্ষুধা আজও ফুরায়নি। আত্মা যতোদিন না ধ্বসে যাবে পুরোপুরি, ততোদিন কবিতা থাকবে, পারমাণবিক বোমার পাশাপাশিও কবিতা থাকবে; ভূপাল ট্যাজেডির মতো বাতাসে ভেসে বেড়াবে বিষাক্ত গ্যাস-ফুকোশিমার চুল্লি ভেঙে বেরিয়ে পড়বে তেজস্ক্রিয়া, রাশিয়ার খোলা নতুন ফ্রন্টে আকাশে বেমালুম ধ্বংস করে দেয়া হবে বেসামরিক যাত্রিবাহী মালয়েশিয়ান বিমান- তবুও কবিতা থাকবে, অন্তরঙ্গ ও নিজস্ব ঐশ্বর্য নিয়ে!

আমরা দেখছি, আমাদের কবিতা জীবনানন্দ ও বোদলেয়ারীয় এই দুই ঘোরে এখনো আক্রান্ত; শুধুই হয়ে উঠছে বিশুদ্ধ শিল্পের মুখবন্ধ।

তাহলে কি আমরা আমাদের চারপাশ নিয়ে কিছু লিখবো না? এই সময়ের জীবন লিখবো না? আমরা কি লিখবো না বস্তিজীবনের কথা? আমরা কি প্রদীপের নিচে অন্ধকার দেখবো না? নাকি শুধুই বিমূর্ততায় ঢেকে দিতে চাইবো কাঁচ ঘঁষে দেয়ার মতো করে, একটু অস্পষ্ট করে? আমরা ড্রইংরুম আর কবিতাসন্ধ্যার আলোকউৎসবে কেবলই ভেসে বেড়াবো? শুধু কি অলীক সন্ধ্যার দিকে উড়ে যাবো ভৌতিক ভাষাকল্পে ভর করে চাঁদের জিহ্বার দিকে? কেন তাকাবো না সিগন্যালে; ফুলবেঁচা কিশোরীটির রুদ্ধশ্বাস আনন্দের দিকে? আমরা কি শুধুই লিখবো বস্তুর বর্ণনা- টেক্সট-ম্যাসেজ-ইমেইল-চ্যাটবক্স, শুধুই লিখবো কথা রাঙানো যান্ত্রিকতার, যেখানে প্রাণ থাকবে না-কোনো জীবন্ত আনন্দ থাকবে না? এরকম লিখবো না?

‘তোমার ভেতর এইহাত রাখতে গিয়ে
আমি থমকে দাঁড়ালাম
এই গাছ, ও গাছ, তোমার বাকলে
এত যতিচিহ্ন কেন ? এত ছোঁয়া, জলরেখা- কার ?
টুকরো রোদ্দুর এসে ফিরে যাচ্ছে
ভাঙা ভাঙা খণ্ড খণ্ড ছায়া কার কথা বুকে করে ফেরে ?
ধুলো ওড়ে ধুলো ওড়ে পায়ে পায়ে পথরেখাÑ
ঘরে যায় কোন অচেনার ?
এ্ই গাছ, বলো না বিশ্বাস থেকে আজকাল
এত মেঘ হয় কেন ?
আকাশ যেখানে এসে মাটিতে নেমেছে সেইখানে
এত রেখা উপরেখা জন্ম নিল কবে !
আমি হাত রাখতে গিয়ে দেখি
কোত্থাও কিচ্ছুটি নেই, শুধু
বিস্ময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে !’

(গাছ/দীপশিখা পোদ্দার)

এই কবির আমার এই প্রথম কবিতা পড়া, এ বছরে প্রকাশিত একটি ছোটকাগজে! এর আগে কখনো পড়িনি। প্রথম পাঠেই মুগ্ধতার গল্প। এতো প্রাণময়তা এ কবিতাপ্রস্তাবের, তা কোথা থেকে উৎসারিত? জীবন থেকেই। আমার ভালো লেগে যায় জীবনের অন্তর্লীন পটভূমি। আমি জীবনের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি, কবিতা হওয়ার মুহূর্তকে সবিস্ময়ে দেখি; তাই তো রোজ কবিতাধর্মদিন; সারাক্ষণ কবিতা অনুরণন, নিঃশ্বাসের পাশাপাশি কবিতা, স্তিমিত পৃথিবীর বিপরীতে সারাক্ষণ হাওয়া-বাতাসের শব্দ, ক্রমাগত বুক পেতে ছোবল

‘অনেকদিন পর সমুদ্রে এসে
আজ রুমেলার কথা মনে পড়ে
মনে পড়ে ক্রিসমাস ক্যারলের মধ্যে দিয়ে
মায়াময়, ধূসর ট্যাক্সি আনাগোনা
বহুদিন পর ঢেউয়ের কাছে এসে
আজ রুমেলার জন্মদিন মনে পড়ে
হয়ত দূরের শহরে কে বা কারা
রুমেলার চারপাশে মোমবাতি জ্বালায়
কেকের টুকরো ওড়ে, কারা সব হাততালি দেয়
অনেক, অনেকদিন পরে ঝাউবনে জ্যোৎস্নার রাতে
তোমার কাছে এসে
রুমেলার ঘ্রাণ মনে পড়ে
সামান্য পাপবোধ ভুলে
সমুদ্রে রাতের হাওয়ায়
তোমার খোলা চুলে
রুমেলার হাসি আঁকি আমি
বালি খুঁড়ে নিজেকে ফিরিয়ে আনি আবার
সমুদ্রে বহুকাল পরে
নীল জলে, রোদে, এইভাবে উড়ে যায়
কবেকার ডানাভাঙ্গা প্লেন
আর তোমার উপত্যকা বেয়ে বিদ্যুৎ
বন্দর খুঁজে পেলে

দূরের শহরে কোথাও
অদ্ভুত শিহরণে রুমেলার ঘুম ভেঙ্গে যায়।’

(দূরের শহরে কোথাও/ সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়)

এই তো সেদিন কথা হচ্ছিলো এসব নিয়ে, কবিতার প্রশ্বাসপ্রবাহ নিয়ে; আজকের পৃথিবীর বাংলা কবিতার ভাষা নিয়ে, সহজবোধ্যতা নিয়ে। নতুন কবিতার ভাষা নতুন ও সহজ। বিগত শতাব্দীর সূর্য ডোবার কালে শেষ দশ বছরে সব ক’টি দশকের কবিরা ও এই শতাব্দীর গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সকলে মিলে লেখা কবিতা অর্থাৎ গত পঁচিশ বছরে প্রকাশিত বাংলা কবিতার গোধূলিসন্ধ্যার দিকে তাকালে মনে হয় কবিতার ভাষার ভেতরে বড় রকমের অভিঘাত ঘটে যাচ্ছে। সুতরাং বিষয় ও অনুষঙ্গে কবিতা যেমন বারবার বদলেছে নাগরিক প্রভাবে, তেমনি নানামাত্রিক বিষয়ের কবিতা লিখতে গিয়ে অবলীলায় কবিতায় স্থান পেয়েছে বিষয়নৈকট্যের শব্দমালা- এসব বিষয়বৈচিত্র্যের ওপর দাঁড়িয়ে কবিতার সহজ ভাষা ও অপর ভাষা নির্মাণের যে প্রচেষ্টা-যে প্রবাহভিড় তার সঙ্গে আগামীর কালপ্রসারী অন্তর্জগত মিলেমিশে এক অনন্য ধারা তৈরি হবে ।

এ সম্পর্কিত আরো লেখা