ফল্গু বসু- এর কবিতা

WotOKwhUNzFBQJH0B9aTIF_orig

সন্ধিক্ষণ

মনে পড়ে সন্ধ্যা ছিল আবেগঘন তখনও
বিস্মিত বা উত্তেজিত ছিলাম আমি নিজে
স্বভাবসুলভ অহংকারের আপত্তি সত্বেও
আকাশ দেখেছিলাম ঘন নীল আকাশের নিচে
প্রয়োজনের সন্ধিক্ষণে ভালো লাগার টান
অক্ষরে অক্ষরে যেন পূর্ব নির্ধারিত
স্বপ্নসফল ম্লান মেয়েটি পাণ্ডুলিপি খুলে
অন্ধ শব্দে ইচ্ছে মতোন স্নেহের দাগ দিতো
ব্যবহার ও ভঙ্গিমাকে খুঁটিয়ে দেখলেও
সহায়তা লুট হয়েছে বিভিন্ন উচ্ছ্বাসে
মিলনসুখের বৃষ্টি দেখে বিদ্যুত্প্রবাহ
রাত্রির প্রণয়চিহ্ন ফুসলে নিয়ে আসে
ছুটি হচ্ছে পরিসরের বাষ্পচোখ খোলা
হেঁটে যাচ্ছি হে উদাসীন সাহায্য ছাড়াই
অনুরোধের বিবেচনা উপলব্ধি করে
প্রমাণস্বরূপ শুশ্রুষাকে কুড়িয়ে নিয়ে যাই।

অনিঃশেষ

তাহলে তো পথেই রাখি জ্বলে ওঠা অন্ধ ক্ষুধা
তাহলে তো দৃষ্টিপ্রকাশ অংশ ঢাকা অশান্ত হাঁস
মুহূর্ত খায় জংলা ছায়া বা পরিহাস
বেলা হলেই অসম্পূর্ণ অনুগ্র্র্রহে রুক্ষ দু’ধার
তাহলে তো শান্ত সকাল অল্প সল্প দুঃখে আমার
অনুসরণ ফসকে যাচ্ছে শীতল আকাশ
সতর্ক হাত সরায় পাতা জল ভরা চোখ
বা তত্ক্ষণাৎ নিরুদ্দিষ্ট পাখির ওড়া
এস.এম.এসেই তন্দ্র্রা সাহার ধনুক এলো
ভাঙছে ছবি টুকরো টুকরো অসহ্য লোক
ঘাম না মুছে পরিশ্র্রান্ত আমার জন্য গান পাঠালো
মনের মধ্যে উথলে ওঠে উপাসনা এবং খুশি
চিরকালই নিরিবিলি লাল বাকুঁড়া
জলে স্থলে সব মানুষই সাঁতরে চলে স্বপ্ন উদার
ঠিক সময়ে স্পর্শ লেখে একলা থাকা
সকালবেলার অন্য কথা অন্য সুহাস ..

ঝুল বারান্দা

অন্ধকারে ঢিল ছুড়েছ, আহত হবে যে ভ্রমণ সে আশঙ্কা
তোমার কাছে হতচকিত থমকে থাকা আঘাতমাত্র।
নেহাৎ আমি কাছে ছিলাম, বিরল নদীর অন্তঃস্থলও
জানত আমার উপস্থিতি কাজলকালো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়।
ঝুলবারান্দা ঝুঁকে আছে বলেই আরো উসকে দিচ্ছি স্পর্শব্যাকুল
উষ্ণতাকে। এখন আমার ঘরের মধ্যে ছোট বড় প্রচুর পাখি।
আহা, চোখের আড়ালে কে রহস্যময় ব্রতকথার বাঁশি বাজায়?
পুতুল ভাঙা চিত্রকরের স্নেহের স্রোতে আর্দ্র তুমি
ছুঁয়ে আছো আকাশকুসুম। তিনি এখন রাত্রিকালীন
ভোরবেলাকে আরো অনেক সুক্ষ্ম করার স্বাধীন নেশায়
ডুবে আছেন। ইচ্ছে করছে তোমার চোখের পাতায় আমি
বর্ণবোধের আদর লিখি। ইস্ কি দারুণ হাওয়া বইছে
পাতায় পাতায় , সম্ভবত মোহ টানছে অন্যরকম তোমার দিকে।
খুলছ নিজের দিঘির আকাশ, চতুর্দিকে বিপন্ন পা
অন্ধ অচিন বিগ্রহকে আগলে রাখতে ব্যস্ত অধীর।
ভারতচন্দ্র বুঝেছিলেন ঝুলবারান্দা ঝুঁকেই থাকে
অগত্যা মন খুলেই আমি লুকোচুরি খেলছি বেদম ফূর্তি করে।

শাস্ত্রজ্ঞান

বেদীটিকে প্রণামের আগে গম্ভীর ঠোঁটের কথা ভাবি।
কাঁধে রাস্তা ছেড়ে উড়ে আসা ফুল স্থানকাল ভুলে
শাস্ত্রের বচন যদি পুর্ণ হয় সমস্যা নিজেই
অকারণে হাসে। গাছকে জড়িয়ে থাকে গাছ, সুস্থ
বেদীই প্রণাম করে ভক্তদের। হো ..হো..জল ঝুঁকে
মাটিতে উত্তর বোনে বিপর্যস্ত ভেতরের লাল
দেখায় কৃষ্ণকে। ইচ্ছে স্বাস্থ্য ,ভাঁজকরা চোখ মুখ
খুরিতে গরম দুধ বহু ঝড়ঝঞ্ঝা সহ্য করে
এখনও গরম আছে মনে হয়, সংকোচ সত্ত্বেও
বৈষ্ণবের তীর্থক্ষেত্রে গোমাংস খেয়েছি ঘটা করে।
অতঃপর হাওয়া ,পেতলের জলপাত্র , সেজেগুজে
দেখি- চাদরে জড়ানো মৃতদেহে জন্মের সন্দেহ।
বেদী, ফুল, লতাপাতা, রমণীর সরস্বতী রুপ
নিরক্ষর জ্যোত্স্নায় ভেসে চলেছে এই শাস্ত্রজ্ঞান।

প্রতিক্রিয়া

হাতের মুঠোয় আলতো ধরে হাত ছোঁয়া পথ হাঁটতে হাঁটতে
প্রতিক্রিয়া ভুলে যাওয়া অল্পদিনের হলেও সত্যি।
বর্ণময়ের অনুরোধে আকাশ তখন বিবর্ণ না
বরং একটু উষ্ণসরল অতিশয়ের সঙ্গে আছে।
হয়তো কোনও লতার ছায়ায় কোকিল ডাকে দম্পতিকে
লজ্জাও ঠিক সলজ্জ না। জন্মদিনের স্বভাবসুলভ
স্বাধীনতায় ঘুষি চালায় তাপের প্রবল অধিকারে।
স্থানবিশেষে মাঝে মধ্যে বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়
শঙ্খ ঘোরে, তখন তোমার অন্য মূর্তি। মেঘলা পথে
ধ্বনির মায়ায় অসাধারণ আগুন জ্বালছ বারে বারে।
ভাবতে থাকি, সোনার সিগারেট ধরিয়ে খোসমেজাজে
তোমার সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছি। অল্পদিনের হলেও সত্যি
জগৎ তখন আমার প্রতি সম্ভবত স্নেহপ্রবণ।
অবাধ্যতা সমাধানের সম্ভাবনায় উল্টোপথও
যত্ন করে নিমন্ত্রণের খবর পাঠায়। তুমি জানতে
সান্ধ্যকালীন অনুরোধের কৌতুহলে অন্ধকারে সাঁতার কাটি
সে সব স্নিগ্ধ দিনের স্মৃতি তোমার কী আর মনে আছে ?
প্রতিক্রিয়ার প্রথম এবং প্রধান শর্ত রাখতে পারিনি আমিও।

দ্বিখণ্ডিত

পথ হারালাম ভাবতে ভাবতে অন্তরঙ্গ তোমায় পেয়েই
উর্মিমালায় যেতে এখন যত্সামান্য সময় লাগবে।
অসহ্য , কল্পনা করো নিদ্রিত পা পিছলে যাচ্ছে।
নক্ষত্রখচিত পাতা কানে কানে বলছে আরো উত্সাহী হও
সামান্য শ্রীহীন এঞ্জিনের মুখাপেক্ষী সঙ্কট তোমার
ফলে, খোঁজো আয়ুর কুহক কিংবা করো ভাব বিনিময়
নিজের সঙ্গে। নইলে আবার নতুন করে বাড়ি বানাও
পথকে বলো পথের কথা। তেজস্ক্রিয় যুগ্মপাখির
উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে নিষিদ্ধরঙ অনুসরণ
না করেও তোমায় আমি পাল্টে ফেলি, মায়াবৃন্ত খায় আমাকে
সবুজ মোড়ায় বসেছে মাঠ। উড়ন্ত পদতল আবারও
নামায় নদীর বিগ্রহকে দেখার জন্য মাঝির ঘরে।
মনে মনেই আমি তোমার ওষ্ঠ আঁকি দৃষ্টি সারাই
দ্বিখণ্ডিত বাংলাতেও হাস্নাহেনার গন্ধ পাচ্ছি।
গন্তব্য কী আদৌ ছিল চণ্ডীদাস ও রজকিনীর?
রঙের অভাব, দাগ ধরা পা চেনো বলেই নিজের ওপর
আস্থা রেখে তুমি বলছ- সামনে ঝুঁকি, আস্তে চলো।

ফল্গু বসু:
…………
জন্ম: ১৬ মে ১৯৫৬। শিক্ষা: রাণাঘাট ও শান্তিপুর কলেজ। পেশায়: গ্রন্থাগারিক। কবিতার বই: ১. অবাধ্যের পুথিঁ ২. অক্ষরবল্কল ৩. ভূভারত সুধাময় ৪. মৃদুচিহ্ন ৫. স্বভাববর্ণ ৬ . করতলে ভাগ্য রেখা নেই ৭ .হাঁটছে হাতের লেখা।

এ সম্পর্কিত আরো লেখা