অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেয়নি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান

school-beton

অতিরিক্ত টিউশন ফি ফেরত দিতে শিক্ষামন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হলেও রাজধানীসহ সারাদেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আদায়কৃত অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেয়নি। এছাড়া শিক্ষা বোর্ডগুলোও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায়কারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা চূড়ান্ত করতে পারেনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, শিক্ষা বোর্ডের তালিকা পেলে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত না দেওয়া প্রতিষ্ঠানের ম্যানিজিং কমিটি বাতিল করা হতে পারে। একইসঙ্গে অষ্টম বেতন কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বেতন নির্ধারণ করে দেওয়ার চিন্তা ভাবনাও চলছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) সূত্র জানায়, সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদনে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট জোসেফ স্কুল, মোহম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল, উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মিরপুর পুলিশ স্মৃতি স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ রাজধানীর অনেক নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৪০ শতাংশ থেকে ১০০ ভাগ বেতন বৃদ্ধির প্রমাণ পেয়েছে।

রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক আঞ্জুমান আলম বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার যেভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন সে অনুযায়ি আমরা টাকা ফেরত পাইনি। অতিরিক্ত মাসিক বেতনের সমন্বয় করলেও অতিরিক্ত সেশন ফির টাকা ফেরত দেয়নি। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ অবমাননা করেছেন। আমরা তার বিচার চাই।

এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, দুই দিন আগে থেকেই অর্থ ফেরত দেয়া শুরু করেছি। তবে আমাদের আইটির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ হয়, সে কারণে সব কিছু প্রসেস (ব্যবস্থা) করতে একটু সময় লাগছে।

অতিরিক্ত সেশন ফি ফেরত দেয়া হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টাকা আদায় করা যতটা সহজ, ফেরত দেয়া ততটা সহজ না। নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে ফেরত দেয়া হবে। পুরাতন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয় করা হবে। এটা প্রসেস করতে কিছুটা সময় লাগবে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ অতিরিক্ত মাসিক ফি নির্ধারণ করলেও অভিভাবকদের আন্দোলনের কারণে তারা অতিরিক্ত মাসিক বেতন আদায় স্থগিত করেছে। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশের পর প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ আগের বছর নির্ধারিত মাসিক বেতন আদায় করছে।

প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মোসাম্মৎ মেহেরুন নেছা (রশ্নি) ও মোসাম্মৎ কারিমুন নেছা (প্রমী) এর বাবা মো. মাহবুবুর রহমান শিক্ষামন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, আটশ` টাকার বেতন ১৭শ` টাকা নির্ধারণ করেছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অভিভাবকদের আন্দোলনের ফলে তা স্থগিত রাখে। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশের পরে সোমবার থেকে আটশ` টাকা আদায় করছে। চাকরি করে দুই মেয়েকে ১৭শ` টাকা বেতন দিয়ে পড়ানো সম্ভব হতো না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ধনিয়া একে হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ সারাদেশের অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আদায় করা অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেয়নি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে একটি গোয়েন্দা সংস্থা সারাদেশের অতিরিক্ত অর্থ আদায়কারী চার শতাধিক প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। ওই সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি বাতিলের চিন্তা ভাবনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সংবাদ সম্মেলন করে বেসরকারি স্কুলে ভর্তি ও এসএসসি ফরম পূরণের সময় নেওয়া অতিরিক্ত ফি সাত দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ওই সময় তিনি বলেন, কোনো কোনো স্কুল মনে করতে পারে, এখন যে ফি নেওয়া হচ্ছে তা বাড়ানো যৌক্তিক। এমন কোনো যুক্তি থেকে থাকে তাহলে আমাদের জানাবেন। আমাদের জানালে আমরা বৈঠক করে পুনর্বিবেচনা করতে পারবো। আমরা নিজ থেকেও পর্যালোচনা করবো।

এরপরেও যদি কেউ তাদের যুক্তি আমাদের জানান, আমরা তাও বিবেচনায় নেবো। কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হয়, ততোক্ষণ পর্যন্ত সবাই এ সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য। অর্থ ফেরত দেওয়ার তথ্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডকে তথ্য জানাতে নির্দেশ দেন।

অতিরিক্ত অর্থ ফেরত না দিলে আদালতের রায় অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও গত ৮ ফেব্রুয়ারি আবারো হুঁশিয়ারি দেন মন্ত্রী। কিন্তু গতকাল বুধবার শিক্ষামন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হলেও রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেয়নি।

একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা দাবি করেন, অষ্টম পে-স্কেলে বেতন দ্বিগুণ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ও দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলেও অধিকাংশ শিক্ষকদের বেতন প্রতিষ্ঠান থেকে দিতে হয়। এই বাড়তি খরচ মেটাতে আদায় করা অর্থ তেমন বেশি নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি মেনে নেবে বলেও তারা আশাবাদী। যে কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অর্থ ফেরত দিচ্ছে না।

ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের বনশ্রী শাখার পরিচালক শেখ মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, আমরা ভাড়া বাড়িতে স্কুল পরিচালনা করি এবং কোনো প্রকার সরকারি সুবিধা নেই না। বেতন না বাড়লে স্কুলই চালানো সম্ভব হবে না। আমরা জানতে পেরেছি সরকারের পক্ষ্য থেকে এ ধরনের স্কুলের ক্ষেত্রে ১০ বা ২০ শতাংশ বাড়তি বেতন আদায়ের নির্দেশনা আসবে। সে কারণে ১৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করেছি।

তিনি আরো বলেন, সরকার যদি এই সামন্য বাড়তি বেতন ফেরত দিতে বলে তাহলে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ মুর্শেদা শাহীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও একই কথা বলেন।

এ বিষয়ে আন্তশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে গত বৃহস্পতিবার চিঠি পেয়েছি। শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় রোববার অনলাইনে চিঠিটি প্রকাশ করেছি এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে তা পাঠিয়েছি। কোন কোন প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছে তা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সরেজিমন পরিদর্শন করে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। প্রতিবেদন পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শিক্ষামন্ত্রীর সাত দিন শেষ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনাদের কাছে সময় শেষ হলে সরকারিভাবে কর্মদিবস গণনা করা হয়। সে হিসেবে এখনও সময় শেষ হয়নি।

প্রসঙ্গত, অষ্টম বেতন কাঠামোতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভর্তি ফি ও টিউশন ফি প্রায় দ্বিগুণ করে। এর প্রতিবাদে অভিভাবকরা রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরে আন্দোলন করে। এরপর টনক নড়ে শিক্ষা প্রশাসনের।

এ সম্পর্কিত আরো লেখা