আশকোনার জঙ্গি আস্তানায় অভিযান : নিহত ২, আত্মসমর্পণ ৪

ashkona

রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনায় জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে যে বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়েছিল ১৬ ঘণ্টা পর তা সমাপ্তি ঘোষণা করেছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। এই অভিযানে দুইজন নিহত এবং চারজন আত্মসমর্পণ করেছে ও একজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় শিশুসহ বেরিয়ে এসে আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এক নারী নিহত হয়েছেন বলে জানায় পুলিশ।
বিকেল তিনটার দিকে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন সুইসাইড ভেস্ট বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন ওই নারী। তার সাথে থাকা শিশুটিকে অবশ্য রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নিহতদের মধ্যে একজন জঙ্গি সুমনের স্ত্রী, তিনি আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন। আরেকজন আজিমপুরে নিহত জঙ্গিদের অর্থদাতা তানভীর কাদেরীর ছেলে আবির ওরফে আদর।
Ashkona-2
শুক্রবার রাত ২টা থেকে দক্ষিণখানের আশকোনার তিনতলা বাড়ি সূর্যভিলায় অভিযানে যায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। পুলিশের বিশেষ বাহিনী সোয়াটও যোগ দেয় এতে। ঘটনাস্থলে রাখা হয় একাধিক ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স।
ঘটনাস্থল থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান জানান, তিনতলা বাড়িটির নিচতলায় জঙ্গি আস্তানা। সেখানে সাতজন ছিলেন। যারা ভেতরে আছে তাদের বারবার আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চারজন আত্মসমর্পণ করে।
সকালে ঘটনাস্থল থেকে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ছানোয়ার হোসেন জানান, চারজন আত্মসমর্পণের পরও তিনজন ভবনের ভেতর ছিল। তারা হলেন- জঙ্গিনেতা তানভীর কাদেরীর ছেলে আবির, জঙ্গি ইকবালের সাত বছরের মেয়ে ও পলাতক জঙ্গি সুমনের স্ত্রী।
ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, আত্মসমর্পণকারীদের কাছে একটি পিস্তল ও গুলি পাওয়া গেছে।
আত্মঘাতী গ্রেনেড বিস্ফোরণে যেভাবে রক্তাক্ত ‘জঙ্গি নারী’
আশকোনার হাজীক্যাম্পের কাছে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ‘সূর্য ভিলা’ নামের একটি বাড়ির নিচতলার দরজা খুলে বের হওয়ার সময় আত্মঘাতী গ্রেনেডের বিস্ফোরণে রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ জানায়, শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার একটু পরে ওই নারী গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটান। আর তার সঙ্গে থাকা সাত বছর বয়সী একটি মেয়েশিশুও আহত হয়।
কীভাবে ওই ‘জঙ্গি’ নারী বিস্ফোরণটি ঘটিয়েছেন, উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ছানোয়ার হোসেন।
ছানোয়ার হোসেন জানান, তিনি ওই বাড়ির গাড়ি পার্কিংয়ের পিলারের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি দেখতে পানে বোরকা পরা একজন নারী বাঁ হাতে একটি মেয়েশিশুকে ধরে বাসার দরজা খুলে বাইরে এসেছেন। ওই দুজন পার্কিংয়ের দিকে আসছিলেন। তখন তিনি তাদের দাঁড়াতে বলেন। বারবার বলেন হাত তুলতে। কিন্তু ওই নারী দাঁড়াননি। তিনি শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে সামনে দিকে হাঁটতে শুরু করেন। একপর্যায়ে বাঁ হাতে শিশুটিকে ধরে রেখে ডান হাত ওপরের দিকে তোলার মতো ভঙ্গি করেন। তবে তখন তিনি কোমরে রাখা বিস্ফোরকে চাপ দেন। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে।
দুপুর দেড়টা পর্যন্ত ওই নারী ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। শিশুটিকে নড়াচড়া করতে দেখে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ হাসপাতালে পাঠিয়েছে বলে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান।
যেভাবে বাসাটি ভাড়া নেন জঙ্গিরা
‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে যে বাড়ি ঘিরে অভিযান চালানো হয়, সেই বাড়ির নিচতলার ভাড়াটিয়ারা বাইরে বের হতেন না। শনিবার এসব তথ্য দেন ওই বাড়ির মালিকের বড় মেয়ে জোনাকি রাসেল।
জোনাকি রাসেল বলেন, তার বাবা মোহাম্মদ জামাল হোসেন বাড়িটির মালিক। তিনি কুয়েতপ্রবাসী। দুই বোনের মধ্যে তিনি বড়। তিনি বাবার বাড়ির কাছেই আরেকটি বাড়িতে থাকেন।
বাসা ভাড়া দেওয়া ও অন্যান্য বিষয়ে জোনাকি রাসেল বলেন, তার বাবার বাড়িতে টু-লেট টাঙানো ছিল। গত ১ সেপ্টেম্বর মো. ইমতিয়াজ আহমেদ পরিচয় দিয়ে একজন নিচতলার বাসাটি দেখতে আসেন। তখন ওই ব্যক্তি নিজেকে অনলাইন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন এবং বলেন যে বাসায় তিনি, তার স্ত্রী ও এক বাচ্চা থাকবে। মাঝেমধ্যে স্ত্রীর বোন এসে থাকবেন। ১০ হাজার টাকায় তিনি বাসাটি ভাড়া নেন। ৩ সেপ্টেম্বর পরিবার নিয়ে তিনি সেখানে ওঠেন।
বাড়িওয়ালার মেয়ে দাবি করেন, বাসা ভাড়া দেওয়ার পর তিনি বেশ কয়েকবার ওই বাসায় গেছেন। বাসায় ল্যাপটপ, খাট, ড্রেসিং টেবিল, ফ্রিজ দেখেছেন।
তিনি বলেন, ‘উনারা কখনো বের হতেন না। বাসায় ওঠার সময় বাচ্চার বয়স ছিল ৪০ দিন।’ কেন বের হন না?—জানতে চাইলে বলতেন, হিজড়ারা বাচ্চা দেখলে টাকা চায়। সে কারণে বের হন না।
তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে দুজন নারী ওই বাসায় আসতেন। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, মা ও এক আত্মীয়। গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছেন।’
বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় পরিবারটি জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি দিয়েছে, ভাড়াটে সংক্রান্ত ফরম পূরণ করেছে এবং সে ফরম থানায় জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান জোনাকি রাসেল।
পুলিশের অভিযান শুরুর বিষয়ে বাড়িওয়ালার মেয়ে বলেন, শুক্রবার রাত ১২টায় পুলিশ তার বাবার বাড়িতে নক করে। তার মা নিচে নেমে যান। তখন পুলিশ তার কাছে নিচতলার ভাড়াটে সম্পর্কে জানতে চায়।
তখন তিনি পুলিশকে বলেন, তার বড় মেয়ে (জোনাকি রাসেল) সব জানেন। তখন তার মা পুলিশকে নিয়ে তার বাসায় যান। তখন তিনি ভাড়াটেদের কাছ থেকে নেওয়া সব কাগজপত্র পুলিশকে দেন। এরপর পুলিশ চলে যায়।
জিম্মি দশা থেকে মুক্ত আলীর বর্ণনায় জঙ্গি আস্তানার চাঞ্চল্যকর তথ্য
আনুমানিক দিবাগত রাত দেড়টার দিকে তাদের ফ্ল্যাটের দরজায় পুনরায় শব্দ হয়। তিনজন পুলিশ সদস্য নিচতলার ফ্ল্যাট সম্পর্কে তাদের কাছে তথ্য জানতে চান। মোহাম্মদ তাদের তিনতলায় বাড়িওয়ালার কাছে যেতে বলেন। এরপর পুলিশ চলে যায়।
সারা রাতে আর কোনো শব্দ শোনেননি মোহাম্মদ। ফজরের আজানের পরে পুলিশ মাইকে নিচতলায় জঙ্গিদের উদ্দেশে বলে, ‘আপনারা বের হয়ে আসেন। আপনাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি করব না। আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। আপনাদের কাছে যে মুঠোফোন পাঠানো হয়েছে, সেটা অন করেন।’
কিছুক্ষণ পরই মাইকে একটি ছেলে কেঁদে কেঁদে আকুতি জানায়, ‘আম্মা, তুমি বের হয়ে আসো। ওরা তোমার কোনো ক্ষতি করবে না। আমরা তোমাকে জীবিত দেখতে চাই।’
সকাল সাড়ে নয়টার পরে জানা যায়, বাড়ি থেকে দুই শিশুকে নিয়ে দুই নারী আত্মসমর্পণ করেছেন। পুলিশ বলছে, তাদের মধ্যে একজন মিরপুরে অভিযানে নিহত জঙ্গি ও সাবেক মেজর জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নেসা শীলা ও তার মেয়ে, আরেকজন পলাতক জঙ্গি মুসার স্ত্রী তৃষ্ণা ও তার মেয়ে।
মোহাম্মদ আলী আরো জানান, এক বছর আগে তিনি ওই বাসার দোতলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। সে সময় বাসাটি দোতলা ছিল। পরে তিনতলা হয়। এরপর বাড়িওয়ালার পরিবার নিচতলা থেকে তিনতলায় উঠে যায়। মাঝে এক পরিবার কিছুদিন নিচতলায় ভাড়া ছিল। পরে তারা চলে যায়। এরপর নিচতলার ফ্ল্যাটে কারা ভাড়া নিয়েছে, তিনি জানেন না। তাদের কখনো দেখা যেত না। এমনকি দরজাও সব সময় বন্ধ থাকত।
মোহাম্মদ আলী বলেন, তিনতলা ভবনটির দোতলা ও তিনতলায় তিনটি করে মোট ছয়টি ফ্ল্যাট রয়েছে। নিচতলায় একটিই ফ্ল্যাট। সেটিই ‘জঙ্গি আস্তানা’ বলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাড়িওয়ালা মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। তার পরিবার তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে থাকে।
শনিবার সকাল সাড়ে নয়টার পরে মোবাইল ফোনে মোহাম্মদ আলী জানান, ওই সময় তিনি ওই ভবনের দুইতলার একটি ফ্ল্যাটে মা আনোয়ারা বেগমকে নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটাচ্ছিলেন।
‘জঙ্গিদের’ কাছে গ্রেনেড আছে বলে গণমাধ্যমের খবরে জেনেছিলেন মোহাম্মদ। আতঙ্কিত কণ্ঠে সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘এখন যদি গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়, আমাদের কী হবে?’ মোহাম্মদ বলেন, ‘বারান্দা থেকে পুলিশকে বলেছি। ওনারা বের করে নিচ্ছে না। পুলিশ বলছে, আপনারা যেখানে আছেন, সেখানেই নিরাপদ।’
দুপুর ১২টার পর মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে ফের জানান, উদ্বেগে একপর্যায়ে করিডরে বের হয়ে আসেন তিনি। পুলিশকে বলেন, ‘আমাদের বাঁচান।’ পুলিশ তার বাসায় তল্লাশি করে জাতীয় পরিচয়পত্র রেখে দেয়। এরপর তাদের বের করে নিয়ে আসে। তিনি পাশেই বোনের বাসায় উঠেছেন।
#

এ সম্পর্কিত আরো লেখা