সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে অল্প বয়সে রোহিঙ্গা মেয়েদের বিয়ে

Rohingya+refugees

কক্সবাজার থেকে সংবাদদাতা
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী মগরা কারণে-অকারণে রোহিঙ্গা মেয়েদের ধর্ষণ করে। বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। এমনটা জানিয়েছেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নারী ও পুরুষরা। তারা জানান, নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে অল্প বয়সেই রোহিঙ্গা মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পরপরই স্বেচ্ছায় তারা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায়। কারণ, বিয়ে হলে বা অন্তঃসত্ত্বা থাকলে সেনাবাহিনী ও মগদের হাত থেকে অনেকটা রেহাই মেলে। এজন্যই খুব কম বয়সে মা হন এবং বেশি সন্তানের জন্ম দেন রোহিঙ্গা নারীরা।
উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পানবাজারের পূর্বপাশে অবস্থিত ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্পের সমন্বয়কারী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন,‘ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্পে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। এরমধ্যে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ অন্তঃসত্ত্বা নারী স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকেন। এদের বেশিরভাগই সন্তান প্রসবকালীন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। ’
অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিয়ে হলে সেনাবাহিনী ও মগরা নির্যাতন করবে না, এই ধারণা থেকে রাখাইনে খুব অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পর খুব দ্রুত তারা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার চেষ্টা করেন। এজন্য রোহিঙ্গা নারীদের একেক জনের ৫-১২টি পর্যন্ত সন্তান রয়েছে। এমনকি কারও কারও সন্তান সংখ্যা ১২-১৪ জন।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এই চিকিৎসাকেন্দ্রে আসা অনেকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। প্রথমে লজ্জায় কথা বলতে রাজি না হলেও পরে তারা কথা বলেন। তারা জানান, সেনা সদস্য ও মগদের হাত থেকে নিজের সম্মান বাঁচাতে পরিবারের সম্মতিতেই অল্প বয়সে বিয়ে করতে হয় তাদের। এছাড়া, অপ্রতুল পারিবারিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও স্বামী-স্ত্রীর অজ্ঞতাসহ নানা কারণেও সারাবছরই অন্তঃসত্ত্বা থাকেন তারা।
বুধবার (২৫ অক্টোবর) সকালে ফ্রি চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন রোহিঙ্গা নারী মুবিনা বেগম, ছফুরা খাতুন ও রমিজা বেগমসহ অনেকে। তারা জানান,সেনা সদস্যদের পাশাপাশি উগ্রপন্থী মগরাও নানা অজুহাতে বাড়ি থেকে মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। অনেক সময় তারা বাড়িতে ঢুকে নির্যাতন চালায়। শুধু এবারই নয়, যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই নির্যাতন।
চোখের পানি মুছতে মুছতে রমিজা বেগম জানান, তার ১৪ বছরের কিশোরী মেয়েকে অপহরণ করেছিল মগরা। সে আর ফিরে আসেনি। এক বছর আগের সেই স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেননি তিনি।
একই কথা জানিয়েছেন রোহিঙ্গা পুরুষরাও। তারা বলছেন, অল্প বয়সে বিয়ে ও পরে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়ে সম্মতি রয়েছে রাখাইনের বেশিরভাগ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের।
রোহিঙ্গা পুরুষ আব্দুল জব্বার,আবুল কালাম ও মুনাফ মিয়া জানান, এটি আমাদের সমাজের রীতি। অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া বা বিয়ে করা ভালো। এতে করে গ্রাম এবং পরিবারের মধ্যে শান্তি থাকে। কেউ চায় না নিজের মা, বোন ও স্ত্রীদের সম্মানহানি হোক।
কক্সবাজার পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা. পিন্টু কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীর সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। বাংলাদেশে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা আসার পর এ পর্যন্ত ৭০০-১০০০ শিশুর জন্ম হয়েছে। প্রতিদিন ৭/৮টি শিশু জন্ম নিচ্ছে ক্যাম্পের বিভিন্ন হাসপাতালে। এ কারণে এখানকার রোহিঙ্গাদের জন্ম নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার কাজ করছে পরিবার-পরিকল্পনা অধিদফতর।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া এই রোহিঙ্গাদের জন্ম নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য চিকিৎসা সেবা দিতে সাতটি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। ২০০ জন কর্মী ক্যাম্পে-ক্যাম্পে গিয়ে তাদের জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অবহিত করছেন। জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের সচেতন করা হচ্ছে।’
উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আশ্রয় নেওয়া অনেকেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের সবার তথ্য আমাদের কাছে নেই। অনেক নারী লোকলজ্জার ভয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন না। আবার অনেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।’

এ সম্পর্কিত আরো লেখা