আঞ্চলিক শীতল যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে লেবানন

Lebanon

লেবাননের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী বলছে দেশটির সামনে মারাত্মক বিপদ অপেক্ষা করছে। আশংকা করা হচ্ছে যে লেবাননের জনগণ ছোট দেশগুলোর বিনিময়ে শ্রেষ্ঠত্ব লাভের আঞ্চলিক বৃহৎ খেলার ফলে সৃষ্ট যুদ্ধের শিকার হতে পারে।
সউদী আরব ও ইরানের মধ্যে শীতল যুদ্ধ এখন খোলাখুলি ব্যাপার। দু’দেশ ইয়েমেন, কাতার, ইরাক ও সিরিয়াসহ কয়েকটি স্থানে সম্পদ ও প্রক্সিদের মাধ্যমে সরাসরি বা পরোক্ষ ভাবে লড়াই করছে। নভেম্বরে সউদী আরবে বসে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরির পদত্যাগের ঘটনায় দেখা যায় যে তাদের মধ্যকার প্রতিদ¦ন্দ্বিতা লেবাননে সম্প্রসারিত হয়েছে।
যে ভাবে তিনি টিভিতে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন, বিশ^ ও তার নিজের লোকদের থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে রিয়াদের একটি গোপন স্থানে অবস্থান এ ধারণার সৃষ্টি করে যে তার পদত্যাগের পিছনে অদৃশ্য হাত রয়েছে।
তবে ভাগ্যক্রমে তিনি গোপন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন ও তাকে প্যারিসে যেতে দেয়া হয়। তারপর তিনি বৈরুতে ফিরে আসেন ও তার দায়িত্ব পালন শুরু করেন। উল্লেখ্য, তিনি পদত্যাগ করলেও লেবাননের প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি।
লেবাননে হারিরির উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বস্তি আনতে সাহায্য করবে। তবে তার পদত্যাগের ব্যাপার নিয়ে সৃষ্ট কুয়াশা শিগগিরই কাটবে বলে মনে হয় না।
সউদী – ইরানের বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পিছনে রয়েছে ধর্মীয় ও কৌশলগত বিষয়। এর সাথে রয়েছে আন্তর্জাতিক অভিলাষ যার প্রতি ওয়াশিংটন তীক্ষè নজর রেখেছে এবং বিভিন্ন পন্থা ও কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে পথ পরিষ্কারের চেষ্টা করছে।
সুন্নী-শিয়া দ্বন্দ্ব ইসলামের ইতিহাসের অংশ, তবে আগে তা মাদরাসা ও মসজিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর তা রাজনৈতিক ও প্রচন্ড জাতীয়তাবাদী বিষয়ে পরিণত হয়। সউদী শাসক কর্তৃপক্ষ এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশে ও অন্যান্য স্থানে কট্টরপন্থী সুন্নী ইসলামকে সমর্থন প্রদান করে।
কয়েকটি মুসলিম দেশে শিয়া ও সুন্নীদের হত্যা হচ্ছে একই ধর্মের দু’টি শাখার মধ্যে হিমশৈলের চূড়ামাত্র। পাকিস্তান ও ইরানের মত দেশ টগবগ করে ফোটা উত্তেজনার মুখে গোষ্ঠিগত সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য লড়াই করছে।
ইরান ও সউদী আরবের মধ্যে ভূ-কৌশলগত উত্তেজনার সাথে জ¦ালানি সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে প্রাধান্য বিস্তার জড়িত। ঐতিহাসিক ভাবে দেখা যায় যে কোনো দেশের প্রাধান্য বহাল থাকে যদি সে যুক্তরাষ্ট্র ও তেলের উপর নির্ভরশীল তার মিত্রদেশগুলোর সাথে অনুকূল মিত্রতাবন্ধনে আবদ্ধ থাকে।
১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ইরান এ অবস্থানে ছিল। কিন্তু ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসার পর সে এ অবস্থান হারায়। আর ইরান তার অবস্থান হারানোর পর সউদীরা তেলের জন্য অবাধ প্রবেশাধিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হচ্ছে ইসরাইল। ইহুদি দেশটির নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ, এটা নিশ্চিত করার জন্য তারা যা খুশি তাই করতে পারে।
এর পর আরেকটি দেশ হচ্ছে লেবানন যেখানে রাজনীতি, আঞ্চলিকতা ও জাতিগোষ্ঠিগত বিরল মিশ্রণ ঘটেছে। ইসরাইলের সাথে সীমান্ত দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিক শ^াপদদের শিকারে পরিণত করেছে।
ইরান সাফল্যের সাথে ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে তার অনুগতদের মাধ্যমে ইসরাইল ও সউদী আরবকে গিরে ফেলার একটি কৌশলগত মহাসড়ক সৃষ্টি করেছে। হেজবুল্লাহর কারণে লেবানন খুবই গুরুত¦্পূর্ণ যারা ইসরাইলের সাথে সরাসরি লড়াই করেছে।
ইরান ও হেজবুল্লাহ উভয়েই সিরিয়ায় লড়াই করছে যা ইসরাইলকে হুমকির শিকার করেছে। এ হুমকি ইসরাইল ও সউদী আরবকে এক ছাতার নীচে নিয়ে আসছে। একটি সউদী মিডিয়ায় সম্প্রতি প্রথম একজন ইসরাইলি জেনারেলের সাক্ষাতকার প্রকাশসহ এ ব্যাপারে আরো কিছু নিদর্শন দেখা যাচ্ছে।
হারিরি তার পদত্যাগের ঘোষণায় তার দেশে হেজবুল্লাহর মাধ্যমে হস্তক্ষেপের জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করেছিলেন। যেহেতু তিনি সউদী আরবেরও নাগরিক সে কারণে তার পদত্যাগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এ ঘটনা লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে রিয়াদ ও তেহরানের ক্রমবর্ধমান সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ।
ইয়েমেনের পর লেবানন আঞ্চলিক শীতল যুদ্ধের নতুন উত্তপ্ত ক্ষেত্র হতে পারে যা দেশের সাময়িক শান্ত অবস্থা ভেঙ্গে দিতে ও গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে পারে। লেবাননের নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে হারিরি এ শান্ত অবস্থা বজায় রাখতে গুরুত্পূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সে কারণে প্যারিসে না থেকে তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত একটি মহৎ ব্যাপার।
হারিরি ও তার হেজবুল্লাহ প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপলব্ধি করা উচিত যে ছায়া যুদ্ধ ও ছায়া গ্রুপের যুগে যে সব শক্তি দুর্বল দেশগুলোর বিনিময়ে গৌরব লাভ করতে চায় তাদের কাছ থেকে যে সব দেশ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে সে সব দেশ শান্তিতে থাকতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরো লেখা